মতামত
গণভোটের প্রশ্নে দ্বিধা, নতুন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কি অনিশ্চয়তার মুখে

গণভোট রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার সর্বোচ্চ প্রকাশ। বিশেষ করে যখন একটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা, জবাবদিহিতাহীন শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার মধ্য দিয়ে যায়, তখন সিস্টেম পরিবর্তনের প্রশ্নে গণভোট অপরিহার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সত্য অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন উন্মোচিত হয়েছিল, তার মূল দর্শন ছিল মুখ বদলের রাজনীতির বাইরে গিয়ে কাঠামোগত সংস্কার। এই অভ্যুত্থান ছিল একটি জমে থাকা ক্ষোভের বিস্ফোরণ। যেখানে মানুষ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে তারা আর আগের শাসনব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায় না। সেই অভ্যুত্থানের পর প্রণীত জুলাই সনদে রাষ্ট্র সংস্কার, ক্ষমতার ভারসাম্য, অবাধ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের প্রশ্নে প্রায় সব রাজনৈতিক দল নীতিগতভাবে একমত হয়েছিল। এই ঐকমত্যের কেন্দ্রে ছিল জনগণের মতামতকে চূড়ান্ত গুরুত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার।
এই প্রেক্ষাপটে গণভোটের প্রশ্নটি সামনে আসে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শুরুতে গণভোটের জন্য আলাদা ভোটের আয়োজন করতে চেয়েছিল। যাতে জনগণ নির্বিঘ্নে ও স্পষ্টভাবে রাষ্ট্র কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে তাদের সিদ্ধান্ত জানাতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিশেষ করে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের আপত্তির কারণে সিদ্ধান্ত হয়, গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসাথে অনুষ্ঠিত হবে। সেই সময় বিএনপি এই সিদ্ধান্তে অংশীদার ছিল, যা থেকে ধারণা জন্মেছিল যে, দলটি অন্তত নীতিগতভাবে গণভোটের বিরোধিতা করছে না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির বিভিন্ন প্রচারণামূলক ভিডিও ও বক্তব্যে গণভোট বিরোধী অবস্থান ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোথাও সরাসরি, কোথাও পরোক্ষভাবে "গণভোটে না" প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এই অবস্থান গভীর উদ্বেগজনক। কারণ গণভোটের বিরোধিতা মানেই জনগণের সরাসরি মতামতকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রবণতা। ইতিহাস বলে, ক্ষমতায় যাওয়ার আগে জনগণের সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাওয়া আর ক্ষমতায় গিয়ে কর্তৃত্ববাদী পথে হাঁটার মধ্যে পার্থক্য খুব বেশি থাকে না।
এখানে এক মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে, বিএনপি কি শেখ হাসিনার শাসনামলের মতোই আরেকটি কেন্দ্রীভূত ও একচ্ছত্র শাসনব্যবস্থার দিকে এগোতে চায়? বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে আন্দোলনের দাবি করে এসেছে। কিন্তু যদি দলটি গণভোটের মতো একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ভয় পায় বা অস্বীকার করে, তবে সেই দাবির নৈতিক ভিত্তি কোথায় দাঁড়ায়? গণভোটে "হ্যাঁ" ভোটের অর্থ রাষ্ট্রের সিস্টেম পরিবর্তনের পক্ষে জনগণের স্পষ্ট রায়। যদি গণভোটে "হ্যাঁ" ভোট জয়ী না হয়, তবে বর্তমান কাঠামোর ভেতরেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং পুরোনো ব্যবস্থার ধারাবাহিকতাই বজায় থাকবে। তখন সরকার বদলালেও সিস্টেম বদলাবে না। যার পরিণতি অতীতে আমরা বহুবার দেখেছি।
বাংলাদেশের ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, ১৯৫২ ও ১৯৭১ যেমন জাতির চেতনায় গভীরভাবে প্রথিত; ঠিক তেমনি ২০২৪ নতুন বাংলাদেশের জন্য একটি সন্ধিক্ষণ। এই সময়ের গুরুত্ব রাষ্ট্রচিন্তার পুনর্গঠনের। জনগণ এই মুহূর্তে স্পষ্টভাবে জানতে চায় কে সত্যিকার অর্থে সিস্টেম পরিবর্তন চায়, আর কে শুধু ক্ষমতার পালাবদলে আগ্রহী। গণভোটকে দুর্বল করা বা এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া মানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। যদি রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে করা অঙ্গীকার থেকে সরে আসে তবে সেই সনদ কেবল একটি প্রতীকী নথিতে পরিণত হবে, যার বাস্তব প্রভাব শূন্য। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের হতাশা আরও গভীর হবে এবং সেই হতাশা শেষ পর্যন্ত আবারও রাজপথে বিস্ফোরিত হতে পারে।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, জনগণের আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে কোনো রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না। যদি গণভোটের মাধ্যমে জনগণকে তাদের সিদ্ধান্ত জানানোর সুযোগ না দেওয়া হয়, কিংবা সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা হয়, তবে তা ভবিষ্যতে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থান বা আরও গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতার পথ প্রশস্ত করতে পারে। সুতরাং প্রশ্নটি এখন আর গণভোট হবে কি হবে না এতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশ কি সত্যিকার অর্থে একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে যাবে, নাকি পুরোনো কাঠামোর মধ্যেই নতুন মুখ বসিয়ে আবারও একই চক্রে আবর্তিত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে গণভোটের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানের ওপর। জনগণ এখন দেখছে, কারা সত্যিকার অর্থে পরিবর্তনের পক্ষে আর কারা পরিবর্তনের ভয়েই "না" প্রচারণায় নেমেছে।
- রাকিবুল হাসান মুন্না, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
জনপ্রিয়
সর্বশেষ
মতামত থেকে আরও পড়ুন
নৈতিকতার অবক্ষয় না কি সময়ের পরিবর্তন
সমাজ কখনোই স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্যবোধ, চিন্তা ও আচরণ পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে যে পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে, সেগুলো অনেকের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার বিস্তারের কারণে মানুষের সম্পর্ক, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

রক্তে ভেজা উদীচী, তবু থামেনি প্রতিবাদের সুর
মৌলবাদী শক্তি বরাবরই সংস্কৃতি চর্চাকে তাদের মতাদর্শের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ, সংস্কৃতি মানুষের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করে, প্রশ্ন করার সাহস দেয় এবং মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে তোলে। এ কারণেই ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকার খাবার পানির ভবিষ্যৎ কী?
ঢাকা আজ শুধু যানজট, বায়ুদূষণ বা আবাসন–সংকটের শহর নয়, এটি দ্রুত একটি পানিসংকটের শহরে পরিণত হচ্ছে। রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গত দুই দশকে উদ্বেগজনক হারে নিচে নেমেছে। একই সময়ে আশপাশের নদীগুলো, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু, দূষণে বিপর্যস্ত। জনসংখ্যা বেড়েছে, ঘনত্ব বেড়েছে, আবাসন উল্লম্ব হয়েছে, শিল্পায়ন প্রসারিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এ শহরের ভবিষ্যৎ পানির নিরাপত্তা কোথায় দাঁড়িয়ে?

‘ইনকিলাব’ নিয়ে বিতর্ক: কলম-ওকিল-ইশারাও কি তবে বাংলা নয়?
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘ইনকিলাব’ শব্দ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা হিসেবে সম্মান করতে হলে এ ধরনের স্লোগান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”


.jpg)






