মতামত


রক্তে ভেজা উদীচী, তবু থামেনি প্রতিবাদের সুর


দুরবীন ডেস্ক

দুরবীন ডেস্ক

প্রকাশিত:০৫ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার

রক্তে ভেজা উদীচী, তবু থামেনি প্রতিবাদের সুর

১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে বোমা হামলা ছিল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক চেতনাকে স্তব্ধ করে দেওয়ার এক চেষ্টা । ছবি: সংগৃহীত


মৌলবাদী শক্তি বরাবরই সংস্কৃতি চর্চাকে তাদের মতাদর্শের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ, সংস্কৃতি মানুষের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করে, প্রশ্ন করার সাহস দেয় এবং মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে তোলে। এ কারণেই ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

 

বাংলাদেশেও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ধারাকে বারবার আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো অনেক সময় পরিকল্পিতভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করেছে, যাতে সমাজে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয় এবং মুক্তচিন্তার কণ্ঠস্বর দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০০৫ সালে নেত্রকোনায় উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয়ে বোমা হামলা এমনই এক ঘটনার উদাহরণ, যা দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল। সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে প্রগতিশীল সংগঠনগুলোকে দুর্বল করার লক্ষ্যেই এমন হামলা চালানো হয়েছিল।

 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে আরেকটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে পহেলা বৈশাখে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে, যখন ছায়ানট আয়োজিত নববর্ষের অনুষ্ঠান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। বাংলা নববর্ষ বাঙালির অন্যতম অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন উৎসব। তাই এই আয়োজনের ওপর হামলা ছিল মূলত বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্যের ওপর আঘাত। এর মাধ্যমে উগ্রবাদী শক্তি উৎসব, সংস্কৃতি ও গণজাগরণকে স্তব্ধ করার বার্তা দিতে চেয়েছিল।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও সাংস্কৃতিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে ঘিরে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণার মাধ্যমে কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠী প্রকাশ্যে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছে। এর প্রেক্ষাপটে ঢাকায় উদীচীর কার্যালয়, ছায়ানট ভবনসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

 

একই সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের অফিসও হামলার শিকার হয়। এর মধ্যে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে হামলার ঘটনাও আলোচনায় আসে। এসব ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত মতপ্রকাশের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বিশ্লেষকদের মতে, এসব হামলার পেছনে একটি অভিন্ন প্রবণতা দেখা যায় অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চর্চাকে লক্ষ্যবস্তু করা, আগে থেকে উসকানিমূলক প্রচারণা চালানো এবং সাংস্কৃতিক কর্মী, শিল্পী, লেখক ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে চাপে ফেলা।

 

তবে বাংলাদেশের ইতিহাস ভিন্ন বার্তা দেয়। যতবার সংস্কৃতির ওপর আঘাত এসেছে, ততবারই তা নতুন শক্তি নিয়ে ফিরে এসেছে। উদীচী, ছায়ানটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন আজও সক্রিয় এবং নতুন প্রজন্মের শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা সেই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর হামলার ইতিহাস তাই শুধু সহিংসতার গল্প নয়; এটি প্রতিরোধ, পুনর্জাগরণ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার ইতিহাসও। এই ধারার মধ্য দিয়েই উদীচীসহ প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বারবার জাতিকে নতুন দিশা দেখিয়ে যাচ্ছে।

 
 

সম্পর্কিত

মতামতপ্রতিবাদউদীচী

জনপ্রিয়


মতামত থেকে আরও পড়ুন

বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে

তারেক রহমানের সরকারকে ক্ষমতায় আনা যে বিপ্লব, তা কোনোভাবেই একটি স্বৈরাচারের পরিবর্তে আরেকটি করপোরেট-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য ছিল না যেখানে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ওয়াশিংটনে।

রিয়েল এস্টেট সেক্টরে প্রয়োজন পর্যাপ্ত আধুনিকায়ন

বাংলাদেশের রিয়েল এস্টেট খাত দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাসনের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে এই খাত প্রতিনিয়ত বিস্তৃত হচ্ছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেন হয়েছিল?

মাত্র দেড় বছর আগে সংঘটিত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের রক্তাক্ত আন্দোলন- যাকে অনেকেই ‘জুলাই বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যা দেন তা ঘিরে জনমনে নানা আলোচনা ও বিতর্ক থাকলেও এর পেছনের কারণগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রয়েছে।

নৈতিকতার অবক্ষয় না কি সময়ের পরিবর্তন

সমাজ কখনোই স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্যবোধ, চিন্তা ও আচরণ পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে যে পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে, সেগুলো অনেকের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার বিস্তারের কারণে মানুষের সম্পর্ক, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে।