জাতীয়


প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার ১১ মাসেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি নেই, উল্টো বেড়েছে অনুপ্রবেশ


নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত:০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:২২ পূর্বাহ্ন, সোমবার

প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার ১১ মাসেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি নেই, উল্টো বেড়েছে অনুপ্রবেশ

ছবি: দূরবিন নিউজ


রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার প্রায় ১১ মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি নেই। উল্টো এই সময়ে নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে আরও অন্তত এক লাখ ৩৯ হাজার রোহিঙ্গা। ফলে দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫৪৯ জনে। এতে কক্সবাজারসহ আশপাশের এলাকায় মানবিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

২০২৫ সালের ১৪ মার্চ পবিত্র রমজান মাসে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস-কে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে যান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সে সময় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতারের পর তিনি ঘোষণা দেন, ‘রোহিঙ্গারা আগামী ঈদ নিজ দেশ মায়ানমারেই উদযাপন করবেন।’

 

এই ঘোষণাকে দীর্ঘদিন স্থবির হয়ে থাকা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখেছিল দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক মহল। আশা করা হয়েছিল, এবার অন্তত প্রত্যাবাসনের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। ঘোষণার পর একটি ঈদুল ফিতর পার হয়েছে, সামনে আরেকটি ঈদুল ফিতর আসছে, কিন্তু একজন রোহিঙ্গাও এখন পর্যন্ত নিজ দেশে ফিরতে পারেনি।

 

বরং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘোষণার পর থেকেই মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। স্থানীয়দের হিসাবে, কেবল প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার পরই অন্তত ৫০ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করেছে।

 

এদিকে সরকার কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা—উভয় পক্ষের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, এতে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের পথ সুগম হবে। অন্যদিকে রোহিঙ্গারাও বলছেন, তারা স্থায়ী অবকাঠামো নয়, দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যেতে চান।

 

এ ছাড়া সৌদি আরবে বসবাসরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার জন্য বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এসব রোহিঙ্গা ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে সৌদি আরবে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। এই সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ বলে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়া কার্যত নাগরিকত্ব দেওয়ার শামিল। এতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বড় সংকটে পড়তে হতে পারে।

 

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) দপ্তরের হিসাবে, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এবং নোয়াখালীর ভাসানচর মিলিয়ে ৩৪টি শিবিরে বর্তমানে ১১ লাখ ৭৩ হাজার ১৭১ জন রোহিঙ্গা রয়েছে। স্থানীয় ও বেসরকারি সূত্রের হিসাবে, গত দুই বছরে নতুন করে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের যুক্ত করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫৪৯ জনে।

 

প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ইতিহাস বলছে, ২০১৭ সালের পর বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফেরাতে উদ্যোগ নেয়। ২০১৮ সালে মায়ানমার সরকার ১ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে সম্মতি দিলেও আজ পর্যন্ত একজনকেও পাঠানো সম্ভব হয়নি। নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় প্রত্যাবাসন বারবার ভেস্তে গেছে।

 

উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা আমাদের বলেছিলেন ঈদের আগে ঘরে ফিরব। সেই কথা এখনো কানে বাজে। কিন্তু বাস্তবে আমরা আগের মতোই অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।’

 

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ঘোষণার পাশাপাশি প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে প্রয়োজন শক্ত কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক চাপ, যা এখনো দৃশ্যমান নয়। মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তাহীনতা এবং নাগরিকত্ব ইস্যু অমীমাংসিত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

 

এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়ছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস বলেন, সীমান্ত নজরদারি জোরদার করা হলেও পুরোপুরি অনুপ্রবেশ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।


সম্পর্কিত

প্রধান উপদেষ্টারোহিঙ্গামুহাম্মদ ইউনূস

জনপ্রিয়


জাতীয় থেকে আরও পড়ুন

রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহর তিন শব্দের স্ট্যাটাস, মুহূর্তেই ভাইরাল

রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিন শব্দের একটি সংক্ষিপ্ত স্ট্যাটাস দিয়েছেন সংসদ সদস্য ও এনসিপি নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। পোস্টটি প্রকাশের পরপরই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

হট্টগোলের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির ভাষণ, প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ ও ওয়াকআউট বিরোধী দলের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে হট্টগোলের মধ্যেই ভাষণ শুরু করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ভাষণ শুরুর আগে প্ল্যাকার্ড হাতে প্রতিবাদ জানিয়ে পরে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দল জামায়াতের সংসদ সদস্যরা।

সংসদে শোকপ্রস্তাবে সাঈদী, হাদি, আবরার ফাহাদের নাম যুক্ত করার দাবি বিরোধীদলের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপিত শোকপ্রস্তাবে আরও কয়েকজন ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে বিরোধীদল।

‘আজ থেকে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু’- সংসদে তারেক রহমান

সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আবারও গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো।