জাতীয়
প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার ১১ মাসেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে অগ্রগতি নেই, উল্টো বেড়েছে অনুপ্রবেশ

ছবি: দূরবিন নিউজ
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার প্রায় ১১ মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তবে কোনো অগ্রগতি নেই। উল্টো এই সময়ে নতুন করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে আরও অন্তত এক লাখ ৩৯ হাজার রোহিঙ্গা। ফলে দেশে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫৪৯ জনে। এতে কক্সবাজারসহ আশপাশের এলাকায় মানবিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত চাপ আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
২০২৫ সালের ১৪ মার্চ পবিত্র রমজান মাসে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস-কে সঙ্গে নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে যান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সে সময় রোহিঙ্গাদের সঙ্গে ইফতারের পর তিনি ঘোষণা দেন, ‘রোহিঙ্গারা আগামী ঈদ নিজ দেশ মায়ানমারেই উদযাপন করবেন।’
এই ঘোষণাকে দীর্ঘদিন স্থবির হয়ে থাকা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখেছিল দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক মহল। আশা করা হয়েছিল, এবার অন্তত প্রত্যাবাসনের পথে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। ঘোষণার পর একটি ঈদুল ফিতর পার হয়েছে, সামনে আরেকটি ঈদুল ফিতর আসছে, কিন্তু একজন রোহিঙ্গাও এখন পর্যন্ত নিজ দেশে ফিরতে পারেনি।
বরং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঘোষণার পর থেকেই মায়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে দলে দলে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। স্থানীয়দের হিসাবে, কেবল প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণার পরই অন্তত ৫০ হাজার রোহিঙ্গা কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করেছে।
এদিকে সরকার কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গাদের জন্য স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গা—উভয় পক্ষের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, এতে রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের পথ সুগম হবে। অন্যদিকে রোহিঙ্গারাও বলছেন, তারা স্থায়ী অবকাঠামো নয়, দ্রুত নিজ দেশে ফিরে যেতে চান।
এ ছাড়া সৌদি আরবে বসবাসরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গার জন্য বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এসব রোহিঙ্গা ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে সৌদি আরবে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। এই সিদ্ধান্তকে ‘আত্মঘাতী’ বলে মন্তব্য করেছেন কক্সবাজার নাগরিক ফোরামের সভাপতি আ ন ম হেলাল উদ্দিন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেওয়া কার্যত নাগরিকত্ব দেওয়ার শামিল। এতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বড় সংকটে পড়তে হতে পারে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) দপ্তরের হিসাবে, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এবং নোয়াখালীর ভাসানচর মিলিয়ে ৩৪টি শিবিরে বর্তমানে ১১ লাখ ৭৩ হাজার ১৭১ জন রোহিঙ্গা রয়েছে। স্থানীয় ও বেসরকারি সূত্রের হিসাবে, গত দুই বছরে নতুন করে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের যুক্ত করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩ লাখ ১২ হাজার ৫৪৯ জনে।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ইতিহাস বলছে, ২০১৭ সালের পর বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফেরাতে উদ্যোগ নেয়। ২০১৮ সালে মায়ানমার সরকার ১ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে সম্মতি দিলেও আজ পর্যন্ত একজনকেও পাঠানো সম্ভব হয়নি। নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা ও বসবাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত না হওয়ায় প্রত্যাবাসন বারবার ভেস্তে গেছে।
উখিয়ার কুতুপালং শিবিরের রোহিঙ্গা নেতা সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা আমাদের বলেছিলেন ঈদের আগে ঘরে ফিরব। সেই কথা এখনো কানে বাজে। কিন্তু বাস্তবে আমরা আগের মতোই অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।’
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক ঘোষণার পাশাপাশি প্রত্যাবাসন বাস্তবায়নে প্রয়োজন শক্ত কূটনৈতিক উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক চাপ, যা এখনো দৃশ্যমান নয়। মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত, রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তাহীনতা এবং নাগরিকত্ব ইস্যু অমীমাংসিত থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এদিকে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর চাপ বাড়ছে। কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস বলেন, সীমান্ত নজরদারি জোরদার করা হলেও পুরোপুরি অনুপ্রবেশ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
জনপ্রিয়
সর্বশেষ
জাতীয় থেকে আরও পড়ুন
শেখ হাসিনা ফিরলে আত্মসমর্পণ করে জেলে যেতে হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং দেশে ফেরার পর প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বন্যায় প্রাণহানির জন্য ফ্যাসিস্ট সরকারের অপরিকল্পিত উন্নয়ন দায়ী: রিজভী
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিগত সরকারের অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং প্রকৃতিবিরোধী অবকাঠামো নির্মাণের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। এর ফলেই ব্যাপক প্রাণহানি ও দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নয়াদিল্লিতে বিমসটেক বৈঠকে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ
দিল্লি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে ভারতের দেওয়া ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করলেও আসন্ন ‘বিমসটেক ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার্স মিটিং’-এ অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ।

জুবাইদার স্মৃতিবিজড়িত হোস্টেলে প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) কাজী ফজলুল হক মহিলা হোস্টেল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে কিছু সময় কাটান তারা।








