জাতীয়
পদ্মা ব্যারাজ: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভাগ্য বদলের ৩৪ হাজার কোটি টাকার মহাপরিকল্পনা অনুমোদন

রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তনের আশা করছে সরকার । ছবি: সংগৃহীত
বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার। প্রথম পর্যায়ে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা। বুধবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ৫০ হাজার ৪৪৩ দশমিক ৬৪ কোটি টাকা। প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানিশূন্যতা কমানো, নদী ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন।
রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় নির্মিতব্য ব্যারাজটিতে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে বলে প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করছে সরকার।
প্রকল্পের আওতায় জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ইছামতী-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থায় শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি গোদাগাড়ী পাম্প হাউস, গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র–এ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতেও এটি সহায়ক হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহীসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রায় ২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন হেক্টর আবাদি জমিতে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে জানানো হয়েছে।
প্রকল্পে ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যারাজের ওপরের অংশকে সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ও গ্যাস পাইপলাইনের বহুমুখী করিডোর হিসেবেও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত ২ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন টন ধান এবং ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছ উৎপাদন বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রায় ৪৭ হাজার ৯৫০ শ্রমিকের জন্য ১২ দশমিক ২৫ কোটি ম্যান-ডে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৯ দশমিক ২৭ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিকল্পনায় ৩ হাজার ৪৫০ একর জমিতে প্রায় দেড় লাখ পরিবারের জন্য সাতটি স্যাটেলাইট টাউন ও আধুনিক গ্রামীণ জনপদ গড়ে তোলার বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর ভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী প্রকল্পটি থেকে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক আয় হতে পারে এবং জাতীয় জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে প্রায় শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান রাখতে পারে।
প্রকল্পটি সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ কমাতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। এতে সুন্দরবন এবং উপকূলীয় এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এটি দেশের পানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। একজন কর্মকর্তা বলেন, “ব্যারাজটি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাখ লাখ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে পারে। কৃষি, মৎস্য, শিল্প ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।”
প্রকল্প প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৭০-এর দশকে ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী ও খালে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায় এবং কৃষি, মৎস্য, বনজ সম্পদ ও নৌ-চলাচলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের আগে পদ্মা-গঙ্গা ব্যবস্থায় শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ ছিল প্রায় ৭০ হাজার কিউসেক। ১৯৭৫ সালের পর উজানে পানি প্রত্যাহারের কারণে অনেক সময় সেই প্রবাহ ২০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে আসে।
প্রকল্পটির আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক ও গাইড বাঁধ। গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর জন্য তিনটি অফটেক স্ট্রাকচারও নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নদী ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে গড়াই-মধুমতি ব্যবস্থায় ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার ড্রেজিং এবং হিসনা ব্যবস্থায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখনন করা হবে।
কর্মকর্তারা জানান, ব্যারাজটি ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ইন-স্ট্রিম রিজার্ভার তৈরি করবে, যা পর্যটন, মৎস্য চাষ ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া ভবিষ্যতে নদীর দুই তীরে সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে আরও কয়েকশ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
সর্বশেষ
জাতীয় থেকে আরও পড়ুন
শেখ হাসিনা ফিরলে আত্মসমর্পণ করে জেলে যেতে হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি বলেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং দেশে ফেরার পর প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বন্যায় প্রাণহানির জন্য ফ্যাসিস্ট সরকারের অপরিকল্পিত উন্নয়ন দায়ী: রিজভী
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিগত সরকারের অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং প্রকৃতিবিরোধী অবকাঠামো নির্মাণের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। এর ফলেই ব্যাপক প্রাণহানি ও দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নয়াদিল্লিতে বিমসটেক বৈঠকে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ
দিল্লি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিষয়ে ভারতের দেওয়া ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করলেও আসন্ন ‘বিমসটেক ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার্স মিটিং’-এ অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ।

জুবাইদার স্মৃতিবিজড়িত হোস্টেলে প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ডিএমসি) কাজী ফজলুল হক মহিলা হোস্টেল পরিদর্শন করেছেন। এ সময় হোস্টেলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে কিছু সময় কাটান তারা।








