আন্তর্জাতিক
মধ্যপ্রাচ্যে কেন ক্রমেই ‘বন্ধুহীন’ হয়ে পড়ছে ইরান?

ইরানের তেহরানে শুক্রবারের নামাজের আগে ফিলিস্তিনিপন্থী সমাবেশে একজন মুসলিম ধর্মগুরু ফিলিস্তিনি ও ইরানি পতাকা ধরে আছেন
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আবারও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বিশ্বরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে একটি প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে ইরান কি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমেই ‘বন্ধুহীন’ রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে?
সম্প্রতি দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, আঞ্চলিক চাপ ও কৌশলগত হিসাব নিকাশের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ হন। প্রতিবেদনে মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়, তখন ইরান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না। তবে আঞ্চলিক মিত্রদের মতে, সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সেটিই ছিল ‘উপযুক্ত সময়’।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এবং দীর্ঘ ইতিহাসের অধিকারী দেশটি সংকটের মুহূর্তে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কার্যত একা হয়ে পড়েছে—এমন ধারণা বিশ্লেষকদের মধ্যে জোরালো হয়েছে।
ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত রাশিয়া ও চীনও সামরিক বা প্রত্যক্ষ কূটনৈতিক সহায়তায় এগিয়ে আসেনি। গত বছরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সময় একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়। তখনও এই দুই দেশ কেবল উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশে সীমাবদ্ধ ছিল।
টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ক্রমশ বিচ্ছিন্ন অবস্থানে চলে গেছে। তেহরান আশা করেছিল, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো অন্তত কূটনৈতিকভাবে তাদের পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে সেই সমর্থনও খুব একটা দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই ইরানের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। নতুন শাসনব্যবস্থা পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়। এর ফলে ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তীব্রভাবে অবনতি ঘটে।
ধর্মীয় মতপার্থক্যও অনেক আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের দূরত্ব বাড়িয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ আরব দেশ সুন্নি অধ্যুষিত হলেও ইরান মূলত শিয়া রাষ্ট্র। এই ধর্মীয় বিভাজন আঞ্চলিক রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব বাড়াতে ইরান ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সংগঠনকে তেহরান ‘প্রতিরোধ বলয়’ হিসেবে উল্লেখ করলেও পশ্চিমা দেশগুলো অনেক সময় তাদের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
এই কারণেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের ভাবমূর্তি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অনেক দেশের কাছে ইরানের ভূমিকা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়া ও চীন ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখলেও তারা সরাসরি সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়।
সম্প্রতি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার সমালোচনা করে এটিকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছে। একই সঙ্গে তারা যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। তবে এই সমর্থন মূলত কূটনৈতিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক সাময়িকী পলিটিকোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়ার সমর্থনেরও একটি সীমা রয়েছে। ইরান হামলার পর মস্কোর প্রতিক্রিয়া মূলত সহানুভূতি ও রাজনৈতিক সমর্থনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, গত চার দশকে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকার কারণে ইরান ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এক ধরনের কৌশলগত বিচ্ছিন্নতার মধ্যে পড়েছে।
একসময় পারস্য সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই দেশটি এখন জটিল কূটনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি। ফলে অনেক বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান সংকটে ইরানকে কার্যত ‘বন্ধুহীন’ বলেই মনে হচ্ছে।
জনপ্রিয়
আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন
আহত হলেও নিরাপদে আছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি
যুদ্ধকালীন ঘটনায় আহত হলেও বর্তমানে নিরাপদ ও সুস্থ আছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। বুধবার (১১ মার্চ) এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছেলে ও সরকারের উপদেষ্টা ইউসেফ পেজেশকিয়ান।

ট্রাম্পকে চাপে ফেলতে দীর্ঘ যুদ্ধের কৌশল নিচ্ছে ইরান, বলছেন বিশ্লেষকরা
যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও একাধিক ফ্রন্টে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাইরে থেকে ইরানের প্রতিক্রিয়া কিছুটা অগোছালো মনে হলেও বাস্তবে এটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার একটি পুরোনো যুদ্ধ কৌশলের অংশ।

ইরান ও লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলা, বৈরুতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। ইরান ও লেবাননের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। একই সময়ে ইরানও পাল্টা হামলার দাবি করেছে, যার ফলে পুরো অঞ্চলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় হোম অফিস চালু থাইল্যান্ড–ভিয়েতনামে
জ্বালানি সাশ্রয় এবং তেলের দামের অস্থিরতা সামাল দিতে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য হোম অফিস পদ্ধতি চালুর নির্দেশ দিয়েছে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দেশ দুটির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা থেকে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।


.jpg)






