রাজনীতি
খালেদা জিয়া: আপসহীন রাজনীতির প্রতীক, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী
.webp)
ডিসেম্বরের শুরুতে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে একটি দৃশ্য অনেককে নাড়া দিয়েছিল। হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৪৮ বছর বয়সী বিএনপির তৃণমূল কর্মী টিপু সুলতান। প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- আমি বেগম খালেদা জিয়াকে নিজের কিডনি দান করতে চাই।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা শুধু একজন নেত্রীর প্রতি ভালোবাসাই নয়, বরং খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের গভীর প্রভাবকেই সামনে নিয়ে আসে।
২৩ নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। টিপু সুলতান তখন হাসপাতালের সামনের ফুটপাতেই দিন কাটাচ্ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি আমার মায়ের মতো। গণতন্ত্রের জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে ৩০ ডিসেম্বর ভোরে। ৭৯ বছর বয়সে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির তিন দশকেরও বেশি সময়জুড়ে চলা এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন যেমন দীর্ঘ, তেমনি ছিল সংগ্রামময়। ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়া শৈশব ও কৈশোর কাটান সেখানেই। দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও সুরেন্দ্রনাথ কলেজে পড়াশোনা শেষে তাঁর জীবন একেবারেই ভিন্ন পথে মোড় নেয় ১৯৮১ সালের ৩০ মে, যখন এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও তাঁর স্বামী জিয়াউর রহমান নিহত হন।
স্বামীর মৃত্যুর পর বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে পড়লে দলীয় নেতাদের অনুরোধেই রাজনীতিতে আসেন খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালে সাধারণ সদস্য হিসেবে বিএনপিতে যোগ দিয়ে মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তিনি দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে দ্রুতই তিনি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি হন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী। দক্ষিণ এশিয়ায় ইন্দিরা গান্ধী ও বেনজির ভুট্টোর কাতারে জায়গা করে নেন খালেদা জিয়া। পরে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও তিনি প্রধানমন্ত্রী হন।
তাঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, রপ্তানিমুখী শিল্প, পোশাক খাতের বিকাশ এবং বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। ২০০৬ সালে তাঁর সরকারের শেষ বছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ শতাংশে পৌঁছায়, যা তখনকার জন্য ছিল উল্লেখযোগ্য।
তবে সমালোচনাও তাঁর পিছু ছাড়েনি। সার সংকট, নির্বাচন বিতর্ক, বিরোধী দমন-পীড়নের অভিযোগ এবং ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার মতো ঘটনাগুলো তাঁর সরকারের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এসব বিতর্কের মধ্য দিয়েই খালেদা জিয়ার রাজনীতি হয়ে ওঠে তীব্রভাবে মেরুকৃত।
২০০৭ সালের ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে কারাবরণ, দুর্নীতি মামলায় দণ্ড, রাজনৈতিক নিঃসঙ্গতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের গভীর ট্র্যাজেডি সব মিলিয়ে তাঁর জীবনের শেষ এক দশক ছিল কঠিন সংগ্রামের। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু এবং বড় ছেলে তারেক রহমানের দীর্ঘ নির্বাসন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করে।
তবু সমর্থকদের কাছে খালেদা জিয়া ছিলেন আপসহীন নেতৃত্বের প্রতীক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার বাইরে থেকেও তিনি কখনো দেশ ছাড়েননি, আপস করেননি এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধের ভাষাও ব্যবহার করেননি। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর মুক্তি পাওয়ার পর তাঁর সংযত বক্তব্য অনেকের কাছেই বিস্ময় জাগিয়েছিল।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরীর ভাষায়, ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে দেশ ও গণতন্ত্রকে বড় করে দেখার মানসিকতাই তাঁকে আলাদা করে তোলে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির সামনে নতুন প্রশ্ন নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ। তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। আসন্ন নির্বাচনই নির্ধারণ করবে, খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কতটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
একটি বিষয় অবশ্য অনস্বীকার্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া শুধু প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি ছিলেন আপসহীন রাজনীতির এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতীক। তাঁর প্রস্থান একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রভাব রাজনীতিতে আরও দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে।
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
সর্বশেষ
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি মির্জা আব্বাস
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস অসুস্থ হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে জোর আলোচনা, সভাপতি–সম্পাদক পদে একাধিক নেতা আলোচনায়
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নতুন কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। যে কোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। রোববার (৮ মার্চ) বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, দ্রুতই ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নতুন কমিটি প্রকাশ করা হবে। তাঁর এ বক্তব্যের পর থেকেই সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব নিয়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে।

জবি ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বের দৌড়ে শাহরিয়ার,পরাগ ও রুমি
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় উঠে এসেছে তিন নেতার নাম তারা হলেন- মো. শাহরিয়ার হোসেন, সাখাওয়াতুল ইসলাম খান পরাগ ও মোস্তাফিজুর রহমান (রুমি)।

বিদেশি চুক্তি নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি: জামায়াত আমির
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে হওয়া আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।


.jpg)






