মতামত


ভোটের আগে ডিজিটাল বিভ্রান্তি: বট, ফেক আইডি ও ভুয়া জরিপ


সহ-সম্পাদক

শাহারিয়া নয়ন

প্রকাশিত:৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার

ভোটের আগে ডিজিটাল বিভ্রান্তি: বট, ফেক আইডি ও ভুয়া জরিপ

ছবি: দূরবিন নিউজ


বাংলাদেশে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সম্ভাব্য গণভোটকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দৃশ্যপট এখন শুধু মিটিং-মিছিল, পোস্টার বা জনসভায় সীমাবদ্ধ নেই। রাজনীতির বড় অংশ সরে গিয়েছে ডিজিটাল পরিসরে ফেসবুক টাইমলাইন, ইউটিউব শর্টস, টিকটক ভিডিও এবং এক্স (টুইটার) থ্রেডে। তবে এই ডিজিটাল রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট হলো এখানে যা দেখা যায়, তার সবটাই বাস্তব নয়। অনেক সময় দৃশ্যমানতাই বাস্তবতার জায়গা দখল করে নেয়। এর ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় গড়ে ওঠে এক ধরনের “কৃত্রিম জনমত”, যেখানে গুজব, অপতথ্য ও পরিকল্পিত বিভ্রান্তি মিলেমিশে রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে জামায়াত-শিবিরপন্থী অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপগুলোর অস্বাভাবিক সক্রিয়তা। পোস্টের পর পোস্ট, মন্তব্যের ঢল, লাইক ও শেয়ার দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে তারা কি ভোটের রাজনীতিতেও এগিয়ে? বাস্তবতা ভিন্ন। সোশ্যাল মিডিয়ার চিত্র ও মাঠের জনমত এক নয়।

 

সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এমনভাবে কাজ করে যে ব্যবহারকারী যেসব কনটেন্ট একবার দেখেন, সেগুলো বারবার তার সামনে আসে। অল্প কিছু সংগঠিত কনটেন্টও “সবাই এটাই বলছে” এই ধারণা তৈরি করতে পারে। ধরুন, কেউ একদিন কয়েকটি জামায়াতপন্থী পোস্টে ইন্টার‌্যাকশন করেছেন। অ্যালগরিদম ধরে নেবে, এটাই তার আগ্রহ। পরের দিন একই ধরনের কনটেন্ট আরও বেশি দেখানো হবে। কয়েক দিনের মধ্যেই একজনের সামনে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বক্তব্য বারবার ভেসে উঠতে শুরু করে। এটি জনমত নয় এটি ‘অ্যালগরিদমিক বাস্তবতা’, যা বাস্তব ভোটার সমাজের প্রতিফলন নয়।

 

জামায়াত-শিবিরপন্থী অনলাইন তৎপরতা স্বাভাবিক উপস্থিতি নয়। এখানে স্পষ্টভাবে একটি সংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করছে। একই পোস্ট, একই ভাষা, একই গ্রাফিক্স একাধিক আইডি থেকে শেয়ার হচ্ছে। মন্তব্যের ভাষা প্রায় হুবহু, বানান ভুলও একই। বিশেষজ্ঞরা এটিকে “ডিজিটাল অর্কেস্ট্রেশন” বলছেন।

 

অদৃশ্য কর্মী, দৃশ্যমান প্রভাব

প্রচারণার বড় অংশ জুড়ে আছে বট ও ফেক আইডি। বিশ্বজুড়ে নির্বাচন ও গণভোটে বট ব্যবহার হওয়া সাধারণ ঘটনা। বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিস্থিতিও এর ব্যতিক্রম নয়। এসব আইডি ব্যক্তিগত ছবি বা পোস্ট নেই, বন্ধু সংখ্যা অস্বাভাবিক, দিনে অসংখ্য রাজনৈতিক মন্তব্য, মন্তব্যগুলো আবেগী, আক্রমণাত্মক এবং নির্দিষ্ট সময় সক্রিয়। বাস্তব ভোটার নয়, কিন্তু তারা বাস্তব ভোটারের মানসিকতায় প্রভাব ফেলে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে ছড়ানো গুজবগুলো কয়েকটি ধারা অনুসরণ করছে—

ভুয়া ‘গোপন জরিপ’: দাবি করা হয় ভেতরের জরিপে জামায়াত এগিয়ে, উৎস প্রকাশ করা হয় না।

ধর্মীয় আবেগ উসকে দেওয়া: নির্বাচনকে ‘ইসলাম বনাম কুফর’ বা ‘ইমান বনাম নাস্তিকতা’ হিসেবে উপস্থাপন।

ভুয়া নিউজ কার্ড: পরিচিত গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে বানানো ছবি।

এআই কনটেন্ট: তরুণ ভোটার বা সাধারণ মানুষ সেজে ভিডিও, বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই।

 

কেন এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়?

ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট: মানুষ সাধারণত বিজয়ীর পাশে দাঁড়াতে চায়।

নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিতিশীলতার প্রস্তুতি: ভোটের ফল পছন্দ না হলে বলা যাবে, “জনমত তো আমাদের পক্ষেই ছিল।”

 

সোশ্যাল মিডিয়ার চিত্র মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে মিলছে কি না এটাই মূল প্রশ্ন। বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতি নির্ধারিত হয় মাঠপর্যায়ের সংগঠন, গ্রাম-মফস্বলে উপস্থিতি, ভোটার উপস্থিতি এবং অতীত নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে। গ্রামবাংলা, শ্রমজীবী শ্রেণি, নারী ভোটার ও মফস্বল অঞ্চলে জামায়াতের প্রভাব সীমিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা সবচেয়ে বেশি সরব, তারা মূলত শহুরে বা প্রবাসী নেটওয়ার্ক, সংগঠিত আদর্শিক কর্মী বা বট।

 

গণভোটে গুজবের বিপদ

গণভোটে মানুষ সরাসরি সিদ্ধান্তে ভোট দেয়। যদি ভোটার ভ্রান্ত তথ্য বা আবেগী গুজবের ওপর ভিত্তি করে ভোট দেন, পুরো প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা নষ্ট হয়। ধর্মীয় ভয়, ষড়যন্ত্রমূলক ভাষা বা ভুয়া তথ্য দ্রুত ছড়ায়। এক গুজব শুধু একজন ভোটারকে বিভ্রান্ত করে না এটি গণতন্ত্রের ভিত্তিক দুর্বলতা তৈরি করে।

 

গণমাধ্যম ও নাগরিকের দায়িত্ব

সংবাদকর্মীর দায়িত্ব শুধু খবর প্রকাশ নয়। মাঠের পাশাপাশি টাইমলাইনে নজর দেওয়া প্রয়োজন। কোনটা তথ্য, কোনটা অপতথ্য তা আলাদা করা জরুরি। নাগরিকদেরও শেয়ার করার আগে উৎস যাচাই, অজানা আইডি বা আবেগপ্রবণ পোস্টে সতর্ক থাকা উচিত।

 

সোশ্যাল মিডিয়া শক্তিশালী, কিন্তু সর্বশক্তিমান নয়। শেষ কথা ভোটারই বলে। ব্যালট বাক্সে ভোটই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। সোশ্যাল মিডিয়ার ঝড় মাঠের ভোটারদের বাস্তব চিত্র নয়। গ্রামবাংলা, মফস্বল, শ্রমজীবী শ্রেণি, নারী ভোটার এগুলো মূল ভোট ব্যাংক, যেখানে জামায়াতের প্রভাব সীমিত। টাইমলাইনের শব্দ কখনো মাঠের আওয়াজ নয়।

 

ডিজিটাল রাজনীতি এখন নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু এটির প্রভাব সীমিত। বাস্তব জনমত, মাঠের সংগঠন, ভোটার উপস্থিতি এগুলোই চূড়ান্ত। গণমাধ্যম ও নাগরিকরা দায়িত্বশীল হলে এই ডিজিটাল বিভ্রান্তি মোকাবিলা সম্ভব। 

 

  • শাহারিয়া নয়ন, সাংবাদিক (মতামত লেখকের নিজস্ব)

সম্পর্কিত

সম্পাদকীয়ভোটজাতীয় নির্বাচনগণভোট

জনপ্রিয়


মতামত থেকে আরও পড়ুন

নৈতিকতার অবক্ষয় না কি সময়ের পরিবর্তন

সমাজ কখনোই স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্যবোধ, চিন্তা ও আচরণ পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে যে পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে, সেগুলো অনেকের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার বিস্তারের কারণে মানুষের সম্পর্ক, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

রক্তে ভেজা উদীচী, তবু থামেনি প্রতিবাদের সুর

মৌলবাদী শক্তি বরাবরই সংস্কৃতি চর্চাকে তাদের মতাদর্শের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ, সংস্কৃতি মানুষের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করে, প্রশ্ন করার সাহস দেয় এবং মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে তোলে। এ কারণেই ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকার খাবার পানির ভবিষ্যৎ কী?

ঢাকা আজ শুধু যানজট, বায়ুদূষণ বা আবাসন–সংকটের শহর নয়, এটি দ্রুত একটি পানিসংকটের শহরে পরিণত হচ্ছে। রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গত দুই দশকে উদ্বেগজনক হারে নিচে নেমেছে। একই সময়ে আশপাশের নদীগুলো, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু, দূষণে বিপর্যস্ত। জনসংখ্যা বেড়েছে, ঘনত্ব বেড়েছে, আবাসন উল্লম্ব হয়েছে, শিল্পায়ন প্রসারিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এ শহরের ভবিষ্যৎ পানির নিরাপত্তা কোথায় দাঁড়িয়ে?

‘ইনকিলাব’ নিয়ে বিতর্ক: কলম-ওকিল-ইশারাও কি তবে বাংলা নয়?

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘ইনকিলাব’ শব্দ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা হিসেবে সম্মান করতে হলে এ ধরনের স্লোগান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”