রাজনীতি
বাংলাদেশের নেতৃত্বের দৌড়ে ‘অচেনা’ ডা. শফিকুর রহমান
.jpg)
ডা. শফিকুর রহমান । ছবি: দূরবিন নিউজ
দীর্ঘদিন বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে প্রায় অচেনা ছিলেন ডা. শফিকুর রহমান। এখন ঢাকার দেয়ালজুড়ে তাঁর ছবি, পোস্টার ও বিলবোর্ড। ৬৭ বছর বয়সী এই চিকিৎসক বর্তমানে জামায়াতে ইসলামীর আমির। এত দিন তিনি মূলত ইসলামপন্থী মহলে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি এখন জাতীয় নেতৃত্বের দৌড়ে দৃশ্যমান এক মুখ। আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি।
২০২৪ সালে জেনজি প্রজন্মের নেতৃত্বে হওয়া গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর জন্য এটি নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুসলিম–সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, প্রায় ৯১ শতাংশ মানুষ মুসলমান। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হলেও সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বিদ্যমান। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামভিত্তিক রাজনীতির নতুন করে উত্থান রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
জনমত জরিপগুলো বলছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াতে ইসলামী এবার তুলনামূলক ভালো ফলের সম্ভাবনায় রয়েছে। এতে উদ্বিগ্ন উদারপন্থী মহলও।
নিষিদ্ধতা থেকে পুনরুত্থান
শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াতের ওপর কড়াকড়ি ছিল। ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধের মামলায় দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। দলটির কার্যক্রম কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে পড়ে। শফিকুর রহমানও ২০২২ সালে গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় ১৫ মাস কারাগারে ছিলেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে যায়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জামায়াতের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল হয় এবং ২০২৫ সালে আদালত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। ফলে দলটি আবার প্রকাশ্যে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়।
এই সময় শফিকুর রহমান সাদা পোশাক ও সাদা দাড়িতে জনসমক্ষে সক্রিয় হয়ে ওঠেন ত্রাণ কার্যক্রম, বন্যাদুর্গতদের সহায়তা এবং দেশব্যাপী সফরের মাধ্যমে দলকে দৃশ্যমান করেন।
ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরিচয়
১৯৫৮ সালে মৌলভীবাজারে জন্ম শফিকুর রহমানের। তিনি এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হন এবং সিলেট অঞ্চলে একটি পারিবারিক হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। ছাত্রজীবনে তিনি প্রথমে জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে দলের ওয়েবসাইটে উল্লেখ আছে। পরে ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগ দেন এবং ১৯৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীতে যুক্ত হন। সময়ের সঙ্গে তিনি জেলা ও মহানগর পর্যায়ের নেতৃত্ব পেরিয়ে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, সেক্রেটারি জেনারেল হয়ে ২০২০ সালে দলের আমির নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে পুনর্নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে,
যুদ্ধাপরাধ মামলায় পুরোনো নেতৃত্বের অবসানের পর দলটি নতুন গ্রহণযোগ্য মুখ সামনে আনার প্রয়োজন অনুভব করে। সেই প্রেক্ষাপটেই শফিকুর রহমানের উত্থান।
‘মধ্যপন্থী’ ইমেজ গঠনের প্রচেষ্টা
শফিকুর রহমান নিজেকে ‘মধ্যপন্থী’ ও ‘যুক্তিভিত্তিক’ নেতা হিসেবে তুলে ধরছেন। তিনি ইসলামী মূল্যবোধের কথা বললেও সব ধর্মের মানুষের জন্য সমান আচরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সুশাসনের কথা তাঁর প্রচারণায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
দলটি জেনজি–নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে জোট করে তরুণ ভোটারদের কাছেও পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, লাইভ স্ট্রিমিং ও সৃজনশীল পোস্টার ব্যবহার লক্ষণীয়।
বিতর্ক
তাঁর ছাত্ররাজনীতির অতীত নিয়ে নানা বিতর্ক রয়েছে। জাসদ ছাত্রলীগে সম্পৃক্ততার দাবি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। শফিকুর রহমান নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তরুণ বয়সে প্রতিবাদী মনোভাব থেকে তিনি জাসদের স্রোতে যোগ দিয়েছিলেন, পরে সেখান থেকে সরে এসে ইসলামী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন ধারণাও রয়েছে যে, স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ অবস্থায় জামায়াত-ঘরানার কিছু কর্মী বাম ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পরে আবার ইসলামপন্থী রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
রাজনৈতিক শূন্যতা ও সুযোগ
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪–এর অভ্যুত্থানের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ নিয়েছেন শফিকুর রহমান। বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ বিদেশে অবস্থানকালে তিনি দেশজুড়ে সক্রিয় উপস্থিতি বজায় রাখেন। এর ফলে গণমাধ্যমে আলোচনায় উঠে আসেন।
“দুই বছরের মধ্যে তিনি প্রান্তিক নেতা থেকে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছেন।”
জামায়াতের সমর্থকদের দাবি, তিনি সৎ, বিনয়ী এবং সহজপ্রাপ্য নেতা। সমালোচকেরা বলছেন, দলটির অতীত ও আদর্শগত অবস্থান নিয়ে জনমনে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। আসন্ন নির্বাচন নির্ধারণ করবে ডা. শফিকুর রহমান কেবল রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে উঠে আসা এক সাময়িক মুখ, নাকি বাংলাদেশের নেতৃত্বের নতুন বাস্তবতার অংশ।
বাংলাদেশের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক পরিসরে তাঁর উত্থান নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যার চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ভর করবে ভোটের ফল ও পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর।
- শাহারিয়া নয়ন, সাংবাদিক ও লেখক
জনপ্রিয়
রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি মির্জা আব্বাস
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস অসুস্থ হয়ে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

ছাত্রদলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে জোর আলোচনা, সভাপতি–সম্পাদক পদে একাধিক নেতা আলোচনায়
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নতুন কমিটি ঘোষণার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। যে কোনো সময় নতুন কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। রোববার (৮ মার্চ) বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, দ্রুতই ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নতুন কমিটি প্রকাশ করা হবে। তাঁর এ বক্তব্যের পর থেকেই সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব নিয়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে।

জবি ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বের দৌড়ে শাহরিয়ার,পরাগ ও রুমি
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শাখা ছাত্রদলের নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় উঠে এসেছে তিন নেতার নাম তারা হলেন- মো. শাহরিয়ার হোসেন, সাখাওয়াতুল ইসলাম খান পরাগ ও মোস্তাফিজুর রহমান (রুমি)।

বিদেশি চুক্তি নিয়ে আমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি: জামায়াত আমির
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে হওয়া আন্তর্জাতিক চুক্তি নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।


.jpg)





