মতামত


কেন অনলাইনে বিপুল ভোটে জয়ী হয় জামায়াতে ইসলাম? শুধুই কি ‘বট আইডি’, নাকি ভিন্ন কিছু?


দূরবিন ডেস্ক

দূরবিন ডেস্ক

প্রকাশিত:১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:০৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার

আপডেট:১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার

কেন অনলাইনে বিপুল ভোটে জয়ী হয় জামায়াতে ইসলাম? শুধুই কি ‘বট আইডি’, নাকি ভিন্ন কিছু?

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বহুল প্রতিক্ষীত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিশ্লেষক মহলে নানা সম্ভাবনা, পূর্বাভাস ও জল্পনা-কল্পনা ঘুরপাক খাচ্ছিল। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া জরিপ এই আলোচনাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছে। রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের নানা প্রান্তে অনলাইন জরিপ যেন রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার এক বিকল্প সূচক হয়ে ওঠে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, ফেসবুক-ভিত্তিক কমেন্ট ভোটের আয়োজন করে কয়েক হাজার পেজ যার মধ্যে মূলধারার গণমাধ্যমের পেজও ছিল। আবার অনেক ইউটিউব চেনেলেও পুলিং ভোটের আয়োজন দেখা গেছে যেখানে প্রচুর সংখ্যক ভোটও পড়েছে। এসব জরিপের প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে দেখা যায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-কে, আর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। অথচ ঐতিহাসিক ও বর্তমান বাস্তবতায় এটি অবিশ্বাস্য হিসেবেই বিবেচনা করা যায়, কিন্তু প্রশ্ন হলো এমনটা কেন হয়? এর পেছনে আসলে মূল ব্যাপারগুলো কী কী?

 

‘বট’ আইডির বিষয়টি এখন বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেক নেটিজেনরাই জানেন, এবং ‘বট’ বলে ট্যাগ করেন, কিন্তু এর বাইরের কারণগুলো নিয়েই আলোচনা বেশি জরুরি এখন। আসলে এখানে জড়িত আরও বেশ কিছু গভীর সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা। তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে দায়িত্বশীলতার ঘাটতি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। ফ্যাক্ট-চেক ছাড়া খবর শেয়ার করা, ভুয়া বা এআই-নির্মিত কনটেন্টে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া দেওয়া, কিংবা ধর্মীয় বার্তা ছড়িয়ে পুণ্য অর্জনের মানসিকতা এই বিষয়গুলোই সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন প্রায় নিত্যদিনের চিত্র হয়ে উঠেছে,। 

 

গবেষণায় দেখা গেছে, ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে তৈরি কনটেন্ট খুব দ্রুত বিপুল সাড়া পায়,  যেমন “ইসলামকে ভালোবাসলে লাইক দিন” শুধু এই একটা টেক্সটেও মিলিয়ন রিচ হতে দেখা গেছে, বস্তুত যেখানে ধর্মের দর্শন সম্পর্কে কোনো আলোচনা নেই। সে সূত্র ধরেই জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য ইসলামী দলের সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন যখন ওই সমস্ত নেটিজেনদের টাইমলাইনে যায়, তখন সেখানে ধর্মীয় আবেগ থেকেও অনেক বড় একটা পজিটিভ ফিডব্যাক যুক্ত হয় দলগুলোর নামের কারণেই। এ ঘটনা শুধু বাংলাদেশে নয়; বরং সনাতন সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ভারতের শিব সেনার ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রবণতা দেখা গেছে। মূলত এ কারণেই সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইনে ধর্মীয় দলগুলো অন্যান্য যে কোনো রাজনৈতিক দলের চেয়ে ভালো ভোট পেয়ে থাকে।

 

তবে এখান থেকেই ভিন্নতার শুরু, সোশ্যাল মিডিয়ায় যে ব্যক্তিরা ধর্মীয় জায়গা থেকে দলগুলোকে সমর্থন জানিয়ে লাইক-কমেন্ট করেছে, তাদের মধ্যে অনেকের প্রোফাইল ঘেঁটে দেখা গেছে, এই ব্যক্তিরা বেশিরভাগই সামাজিকভাবে নানা দর্শনের বিভক্ত। ফলে এখানে এসেই ভোট আর সোশ্যাল মিডিয়া সমর্থনের পার্থক্য ভাগ হয়ে যায়। তাই মোবাইলে ইসলামিক দলকে ভোট দিলেও সামাজিক দর্শন ভিন্ন হওয়ায় তারা ব্যালটে ভোট দেওয়ার আগে  নিজেদের পারিপার্শ্বিক অবস্থার হিসাব মিলায়, ভোটের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ ভোটার লক্ষ্য রাখেন- কোন প্রার্থী পাশ করলে তার ব্যক্তি জীবনের সমস্যাগুলো সমাধান হবে, কোন প্রার্থীর সাথে তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক সুসম্পর্ক বিদ্যমান, এবং আরো অন্যান্য ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তাই হয়ে ওঠে তার কাছে ভোট প্রদানের যৌক্তিকতা। ফলে, যেহেতু বিএনপি এদেশের সমাজ ব্যবস্থায় বৃহত্তর রাজনৈতিক দল এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিতে বিএনপির প্রতিনিধিত্ব বেশি, তাই স্বাভাবিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক ব্যবধানে পরাজিত হওয়া এই দলটি বাস্তবে বড় ধরনের বিজয় অর্জনে সক্ষম হয়েছে।

 

এই বিষয়গুলোকে আমরা যদি আরেকটু গবেষণার জায়গায় নিয়ে যাই তাহলে এখানে আলোচনা করতে হবে মনোবিজ্ঞানী অ্যালেন লুই এডওয়ার্ডসের ‘social desirability bias’ থিওরি। বাংলাদেশ খুব ভিন্নধর্মী আর্থসামাজিক বাস্তবতার দেশ। এখানে দলের নির্দিষ্ট কর্মীরা বাদে সাধারণ ভোটাররা কখনোই নিজেদের প্রকাশ্যে আনতে চান না, এবং প্রকাশ করতে চান না যে তারা আসলে কোন দলের ভোটার! প্রার্থীরা যখন ভোট চাইতে যান, এই ভোটাররা তখন আন্তরিকভাবে প্রায় সকল প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে থাকেন। সে ধারাবাহিকতায় সোশ্যাল মিডিয়াতেও অনেক ভোটার ইচ্ছে করে তার পছন্দের প্রার্থীকে অনলাইনে ভোট দেন না, যেন অন্যরা বুঝতে না পারে তিনি আসলে কোন দলের ভোটার। অ্যালেন লুই এডওয়ার্ডস এই থিওরীতে এই ধরণের ব্যাপারগুলোই আলোচনা করেছেন, এবং কিভাবে একটি বিষয় বাস্তবতার বাইরে গিয়ে ভুল ভাবে অন্যান্য মাধ্যমে ছড়াতে পারে সেটি বিশ্লেষন করেছিলেন, যা আমার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও আরো একবার প্রত্যক্ষ করলাম।”

 

  • শফি-উল মাওলা, কলামিস্ট ও রাইটার

সম্পর্কিত

মতামতবট আইডিজামায়াতে ইসলাম

জনপ্রিয়


মতামত থেকে আরও পড়ুন

নৈতিকতার অবক্ষয় না কি সময়ের পরিবর্তন

সমাজ কখনোই স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্যবোধ, চিন্তা ও আচরণ পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে যে পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে, সেগুলো অনেকের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার বিস্তারের কারণে মানুষের সম্পর্ক, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

রক্তে ভেজা উদীচী, তবু থামেনি প্রতিবাদের সুর

মৌলবাদী শক্তি বরাবরই সংস্কৃতি চর্চাকে তাদের মতাদর্শের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ, সংস্কৃতি মানুষের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করে, প্রশ্ন করার সাহস দেয় এবং মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে তোলে। এ কারণেই ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকার খাবার পানির ভবিষ্যৎ কী?

ঢাকা আজ শুধু যানজট, বায়ুদূষণ বা আবাসন–সংকটের শহর নয়, এটি দ্রুত একটি পানিসংকটের শহরে পরিণত হচ্ছে। রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গত দুই দশকে উদ্বেগজনক হারে নিচে নেমেছে। একই সময়ে আশপাশের নদীগুলো, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু, দূষণে বিপর্যস্ত। জনসংখ্যা বেড়েছে, ঘনত্ব বেড়েছে, আবাসন উল্লম্ব হয়েছে, শিল্পায়ন প্রসারিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এ শহরের ভবিষ্যৎ পানির নিরাপত্তা কোথায় দাঁড়িয়ে?

‘ইনকিলাব’ নিয়ে বিতর্ক: কলম-ওকিল-ইশারাও কি তবে বাংলা নয়?

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘ইনকিলাব’ শব্দ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা হিসেবে সম্মান করতে হলে এ ধরনের স্লোগান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”