মতামত


এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন: নিরপেক্ষতার পরীক্ষা এখনই


দূরবিন ডেস্ক

দূরবিন ডেস্ক

প্রকাশিত:২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০১:০৭ অপরাহ্ন, বুধবার

এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচন কমিশন: নিরপেক্ষতার পরীক্ষা এখনই

ছবি: দূরবিন নিউজ


বাংলাদেশ এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, বরং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতার একটি বড় পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষার কেন্দ্রে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রশ্ন একটাই এবার কি নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তার প্রকৃত ভূমিকা পালন করতে পারবে, নাকি আগের মতোই নির্বাচন একটি পূর্বনির্ধারিত রাজনৈতিক অনুশীলনে সীমাবদ্ধ থাকবে?


সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। আইন অনুযায়ী কমিশনের হাতে রয়েছে প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ, আচরণবিধি প্রয়োগ এবং অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার পূর্ণ ক্ষমতা। কিন্তু ক্ষমতা থাকা আর ক্ষমতা প্রয়োগ করা এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যই বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট। ভারতের সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচন (২০২৪) এই ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটিতে ক্ষমতাসীন দলই হোক বা বিরোধী নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে নির্বাচন কমিশন মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও সতর্ক করেছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট ভারতের নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের ওপর কর্তৃত্ব হারায়নি। বাংলাদেশে এয়োদশ নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্বে এমন কর্তৃত্ব দৃশ্যমান কি না সে প্রশ্ন এখনও অনুত্তরিত।


নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা যদি না থাকে, তবে সবচেয়ে নিখুঁত নির্বাচন ব্যবস্থাও অর্থহীন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভোটার উপস্থিতির হার, বিরোধী দলের অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের চাপে রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক ভূমিকা এখানে তুলনামূলক উদাহরণ হতে পারে। ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে শাসক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি। কারণ কমিশন আগেই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল রাষ্ট্রযন্ত্র নয়, ভোটই চূড়ান্ত। বাংলাদেশে নির্বাচন কমিশন যদি আগাম এমন বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে নির্বাচনের ফল যাই হোক না কেন, বিতর্ক অনিবার্য হবে।


এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো নির্বাচনকালীন প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাস্তবে কার নির্দেশ মানবে? ইন্দোনেশিয়ার ২০২৪ সালের নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন (KPU) সরাসরি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বদলি, শাস্তি ও দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করেছে। কমিশনের সিদ্ধান্ত অমান্য করার নজির সেখানে বিরল। বাংলাদেশে কমিশনের নির্দেশনা অনেক সময় মাঠপর্যায়ে উপেক্ষিত হয় এমন অভিযোগ নতুন নয়। কমিশন যদি এই বাস্তবতা মোকাবিলা করতে না পারে, তবে ‘নিরপেক্ষ প্রশাসন’ কথাটি কেবল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।


কানাডা ও যুক্তরাজ্যে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে সংসদীয় শুনানি ও বহুদলীয় মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক। ফলে কমিশন শুরু থেকেই একটি নৈতিক শক্তি নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশে আইন থাকলেও কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া রাজনৈতিক আস্থার সংকট দূর করতে পারেনি। এয়োদশ নির্বাচনে এই সংকট কাটাতে না পারলে কমিশনের ওপর ‘পক্ষপাতের’ অভিযোগ আবারও ঘনীভূত হবে।


এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের জন্য আরেকটি নিয়মিত দায়িত্ব নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কমিশন চাইলে এই নির্বাচনকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি বাঁকবদলের উদাহরণ বানাতে পারে, আবার চাইলে এটিকে আগের বিতর্কগুলোর ধারাবাহিকতায় ঠেলে দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের সামনে প্রশ্নটি খুব পরিষ্কার তারা কি ক্ষমতার সুবিধাজনক নীরবতার পাশে থাকবে, নাকি সংবিধান ও জনগণের ভোটাধিকার রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেবে? এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ইতিহাসে কী নামে স্মরণীয় হবে।

 

  • বি. এম. হাসান মাহমুদ, লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

সম্পর্কিত

সংসদ নির্বাচননির্বাচন কমিশনমতামত

জনপ্রিয়


মতামত থেকে আরও পড়ুন

নৈতিকতার অবক্ষয় না কি সময়ের পরিবর্তন

সমাজ কখনোই স্থির নয়; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্যবোধ, চিন্তা ও আচরণ পরিবর্তিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে যে পরিবর্তনগুলো দৃশ্যমান হচ্ছে, সেগুলো অনেকের মনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার বিস্তারের কারণে মানুষের সম্পর্ক, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ধারণা অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

রক্তে ভেজা উদীচী, তবু থামেনি প্রতিবাদের সুর

মৌলবাদী শক্তি বরাবরই সংস্কৃতি চর্চাকে তাদের মতাদর্শের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ, সংস্কৃতি মানুষের চিন্তাশক্তিকে জাগ্রত করে, প্রশ্ন করার সাহস দেয় এবং মানবিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে তোলে। এ কারণেই ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে সাংস্কৃতিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটেছে।

ঢাকার খাবার পানির ভবিষ্যৎ কী?

ঢাকা আজ শুধু যানজট, বায়ুদূষণ বা আবাসন–সংকটের শহর নয়, এটি দ্রুত একটি পানিসংকটের শহরে পরিণত হচ্ছে। রাজধানীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গত দুই দশকে উদ্বেগজনক হারে নিচে নেমেছে। একই সময়ে আশপাশের নদীগুলো, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু, দূষণে বিপর্যস্ত। জনসংখ্যা বেড়েছে, ঘনত্ব বেড়েছে, আবাসন উল্লম্ব হয়েছে, শিল্পায়ন প্রসারিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এ শহরের ভবিষ্যৎ পানির নিরাপত্তা কোথায় দাঁড়িয়ে?

‘ইনকিলাব’ নিয়ে বিতর্ক: কলম-ওকিল-ইশারাও কি তবে বাংলা নয়?

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে দেওয়া এক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ‘ইনকিলাব’ শব্দ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। গত ২১ ফেব্রুয়ারি সিরাজগঞ্জে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, “‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান বাংলা ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা হিসেবে সম্মান করতে হলে এ ধরনের স্লোগান গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”