আন্তর্জাতিক
জাপানকে যেভাবে গুপ্তচরদের ঘাঁটি বানিয়েছে রাশিয়া: নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধান

ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য সামরিক ও বেসামরিক উভয়ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি সংগ্রহ এবং গোয়েন্দা তথ্য আহরণের উদ্দেশ্যে জাপানকে কার্যত গুপ্তচরবৃত্তির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে রাশিয়া। জাপানের গুপ্তচরবৃত্তিবিষয়ক আইনের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।
রোববার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সংগ্রহ এবং গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনায় জাপানের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করছে রাশিয়া। এ ক্ষেত্রে দেশটির গুপ্তচরবৃত্তি সংক্রান্ত দুর্বল আইন তাদের জন্য সহায়ক হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে ইউক্রেন সরকারের একটি হিসাবের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের প্রায় ৯০ শতাংশে জাপানি যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়। এই কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন মাক্সিম ভ্লাদিমিরোভিচ ফিলচেনকভ নামের এক রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা। তিনি রুশ বিমান সংস্থা এরোফ্লটের টোকিও কার্যালয়ে কর্মরত থাকার আড়ালে গোয়েন্দা তৎপরতা পরিচালনা করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, রাশিয়ায় সরাসরি রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় জাপান থেকে সংগৃহীত যন্ত্রাংশ ভিয়েতনাম, উজবেকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো তৃতীয় দেশের মাধ্যমে মস্কোয় পাঠানো হচ্ছে। এ কাজে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান এবং যন্ত্রাংশ সংগ্রহকারী একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর সোমবার বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন জাপান সরকারের প্রধান মুখপাত্র মিনোরু কিহারা। প্রতিবেদনের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও তিনি বলেন, বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা আরও কার্যকরভাবে প্রতিহত করা প্রয়োজন।
কিহারা বলেন, "আমরা স্বীকার করছি যে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। বিদেশি গোয়েন্দা তৎপরতা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা জাপানের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। এগুলো প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।"
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম মোকাবিলায় আরও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিচ্ছিন্ন গোয়েন্দা কার্যক্রমগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের লক্ষ্যে পার্লামেন্টে একটি আইন অনুমোদন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে একটি নতুন জাতীয় সংস্থা গঠনের পথ সুগম হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি জাপানি সংবাদমাধ্যম দ্য জাপান টাইমসও প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলো শত শত রুশ গুপ্তচরকে বহিষ্কার করে। একই সঙ্গে ক্রেমলিন-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়।
এর উদ্দেশ্য ছিল ক্রেমলিনের জন্য গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং মাইক্রোচিপ, ট্রান্সমিটার ও অস্ত্র তৈরির যন্ত্রপাতি সংগ্রহ কঠিন করে তোলা। তবে পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বহিষ্কৃত কয়েকজন রুশ গোয়েন্দা পরে জাপানে সক্রিয় হন।
টোকিওতে এই কার্যক্রমের কেন্দ্রে রয়েছে রুশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার একটি গোপন ইউনিট, যা "২০তম ডিরেক্টরেট" নামে পরিচিত। পাঁচটি পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ইউনিটের সদস্যরা কূটনীতিক বা ব্যবসায়ীর পরিচয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রযুক্তি সংগ্রহ এবং সেগুলো রাশিয়ায় পাঠানোর কাজে যুক্ত।
গত মে মাসে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে একটি ভবনে রাশিয়ার কেএইচ-১০১ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে অন্তত ২৪ জন নিহত হন। পরে ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার হওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ পর্যালোচনায় ইউক্রেনীয় তদন্তকারীরা জাপানি প্রযুক্তি ব্যবহারের তথ্য পান।
এরপর নিউইয়র্ক টাইমস বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে গোপন সরকারি নথি, করপোরেট রেকর্ড এবং তিনটি মহাদেশের একাধিক গোয়েন্দা ও সরকারি কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার ব্যবহার করা হয়েছে। জনসমক্ষে গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশের অনুমতি না থাকায় অধিকাংশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছিলেন।
নথিপত্র ও সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা জাপান সরকারের কাছে রুশ অস্ত্রে জাপানি প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রমাণও উপস্থাপন করেছেন। ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন জানালেও এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে জাপান ধীরগতি দেখিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কিছু আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে জাপানের গোয়েন্দা কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল। এমনকি দেশটির নিজস্ব কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাও নেই। এ কারণেই বহুদিন ধরে জাপানকে গুপ্তচরদের নিরাপদ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর প্রায় দুই বছর পর ২০২৪ সালে উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রাংশের ঘাটতিতে পড়ে রাশিয়া। ওই সময় টোকিওতে দায়িত্ব পান জিআরইউর কর্মকর্তা মাক্সিম ভ্লাদিমিরোভিচ ফিলচেনকভ। ব্যবসায়িক নথি ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, তিনি জাপান থেকে রাশিয়ায় পণ্য পরিবহনকারী লজিস্টিকস কোম্পানিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলেন।
সোভিয়েত আমল থেকেই জিআরইউর সদস্যরা পশ্চিমা প্রযুক্তি সংগ্রহে এরোফ্লটের চাকরিকে ছদ্মবেশ হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। জাপানে এরোফ্লটের সরাসরি কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও তাদের অংশীদার প্রতিষ্ঠান প্রোকো এয়ার সক্রিয় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি শ্রীলঙ্কা ও উজবেকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের কার্গো পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে পণ্য রাশিয়ায় পাঠায়।
টাইমসের প্রতিবেদনে মিকি নামে এক জাপানি নাগরিকের সাক্ষাৎকারও প্রকাশ করা হয়েছে। তিনি ফিলচেনকভের পরিচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিষিদ্ধ পণ্য রাশিয়ায় পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, অধিকাংশ চালান ছিল চিকিৎসা সরঞ্জাম ও প্রসাধনী।
প্রমাণ হিসেবে তিনি একটি এয়ার বিল দেখান, যেখানে "আর-ফার্ম" নামটি আংশিক আড়াল করা ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মস্কোভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি আর-ফার্মের প্রতিষ্ঠাতা আলেক্সেই রেপিক প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি এবং তিনি বিভিন্ন সময় রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদেশি সরকারগুলো বারবার জাপানকে সতর্ক করেছে যে দেশটির প্রযুক্তি রাশিয়ায় পাচার হচ্ছে। গত বছরের এপ্রিল মাসে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ইউক্রেন জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে আটটি কূটনৈতিক চিঠি পাঠায়। সেখানে রুশ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামে ব্যবহৃত জাপানি যন্ত্রাংশের ছবি, তালিকা এবং তথ্যপ্রমাণ তুলে ধরা হয়।
ইউক্রেনের এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, চিঠিগুলোতে সার্কিট বোর্ড, ট্রান্সমিটার, সেমিকন্ডাক্টরসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের তথ্য ছিল। নিউইয়র্ক টাইমস এমন একটি চিঠিও পর্যালোচনা করেছে, যেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে জাপানি যন্ত্রাংশ ব্যবহারের তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
ইউক্রেন জাপানের নিপ্পন ইলেকট্রিক করপোরেশন, প্যানাসনিক, তোশিবা এবং আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি যন্ত্রাংশ উদ্ধারের তথ্যও টোকিওকে জানিয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে জেনেশুনে রাশিয়ায় পণ্য পাঠানোর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে এসব পণ্য পুনর্বিক্রি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। নিপ্পন জানিয়েছে, ইউক্রেন যে যন্ত্রাংশ শনাক্ত করেছে, সেগুলো বহু বছর আগে উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে। রুশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা মাক্সিম ভ্লাদিমিরোভিচ ফিলচেনকভের মন্তব্য জানতে তাঁর টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট ও ইমেইলে বার্তা পাঠিয়েছিল নিউইয়র্ক টাইমস। তবে তিনি কোনো জবাব দেননি। প্রতিবেদনের অনুসন্ধান অংশটি দ্য জাপান টাইমস থেকে নেওয়া হয়েছে এবং সংক্ষেপে অনুবাদ করা হয়েছে।
জনপ্রিয়
আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন
তামিলনাড়ুতে গরু জবাই নিষেধাজ্ঞার বিপক্ষে লড়াইয়ে বিজয়
ভারতের তামিলনাড়ুতে কোরবানি ঈদসহ যেকোনো দিনে গরু ও বাছুর জবাই নিষিদ্ধ করার বিষয়ে মাদ্রাজ হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার (১৩ জুলাই) দেওয়া এই আদেশে সর্বোচ্চ আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, হাইকোর্টের রায়ে সংশোধনের প্রয়োজন ছিল।

পাল্টাপাল্টি হামলায় নতুন করে বাহরাইনে মার্কিন ড্রোনবহর ধ্বংসের দাবি ইরানের
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। রোববার দিবাগত রাতে উভয় পক্ষের সামরিক অভিযানে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে চলমান সংকট আরও তীব্র হয়েছে। ইরানের দাবি, তারা বাহরাইনে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে একটি ড্রোনবহর ধ্বংস করেছে। তবে এ দাবির স্বাধীন যাচাই তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব হয়নি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় নতুন করে হামলার কথা জানিয়েছে।

বিয়েতে খাসির বদলে মুরগি, বর-কনে পক্ষের সংঘর্ষে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহত ১২
বিয়ের ভোজে খাসির মাংস পরিবেশনের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু খাবারের টেবিলে গিয়ে দেখা গেল, খাসির বদলে পরিবেশন করা হয়েছে মুরগির মাংস। আর এতেই শুরু হয় বর ও কনেপক্ষের মধ্যে তুমুল বাগ্বিতণ্ডা, যা মুহূর্তেই রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে। লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে দুই পক্ষের অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।

ব্রহ্মপুত্রে চীনের মেগা বাঁধ ঘিরে ভূমিকম্পের শঙ্কা, ঝুঁকিতে ভারত-বাংলাদেশ
তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে (ইয়ারলুং সাংপো) নির্মাণাধীন বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চীনের একদল ভূতাত্ত্বিক। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, মেগা বাঁধটির জলাধার এলাকার ঠিক নিচেই রয়েছে একটি সক্রিয় ভূ-ফাটল (ফল্ট লাইন), যা ভবিষ্যতে বাঁধটির কাঠামোগত স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এ পরিস্থিতি ভাটির দেশ ভারত ও বাংলাদেশের উদ্বেগও আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।








