আন্তর্জাতিক
খ্রিস্টানপ্রধান কলম্বিয়ায় সংখ্যালঘু মুসলমানদের রমজান কেমন কাটছে

ছবি: সংগৃহীত
খ্রিস্টানপ্রধান দেশ কলম্বিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ২ শতাংশেরও কম। দেশটির ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ খ্রিস্টান। শহরের কেন্দ্রজুড়ে গির্জার ঘণ্টাধ্বনি শোনা গেলেও এর মাঝেই ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে মুসলিম সম্প্রদায়। স্থানীয় ইসলামিক কেন্দ্রগুলোর হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে মুসলমানের সংখ্যা ৩৫ থেকে ৪০ হাজার। তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের হিসাবে, আরব বংশোদ্ভূত অভিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করলে এ সংখ্যা এক লাখ পর্যন্ত হতে পারে।
সংখ্যায় অল্প হলেও কলম্বিয়ার মুসলিম সমাজে রয়েছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য কেউ বহু প্রজন্মের অভিবাসী, কেউ আবার ধর্মান্তরিত মুসলমান।
রমজান শুরুর আগে বোগোতা ও মেডেলিনের মতো শহরে মসজিদগুলো আলোকসজ্জা ও ব্যানারে সাজানো হয়। মেডেলিনের বেলেন এলাকার একটি ছোট মসজিদের সামনে সোনালি অক্ষরে লেখা থাকে ‘রমজান কারিম’।
মেডেলিনের এক মসজিদের ইমাম মুতাসিম আবদো জানান, এখানে কলম্বিয়ান ছাড়াও ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, তিউনিসিয়া, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা নামাজ আদায় করেন। চার বছর আগে মিসর থেকে আসা এই ইমামের মতে, সংখ্যায় কম হওয়ায় অনেক অভিবাসী নিজ দেশের রমজানের জাঁকজমক মিস করেন।
২৩ বছর আগে পাকিস্তান থেকে আসা রানা আরিফ মোহাম্মদ শুরুতে একাকিত্ব অনুভব করলেও এখন পরিস্থিতি বদলেছে। তার ভাষ্য, মেডেলিনে এখন অন্তত পাঁচটি মসজিদ রয়েছে।
২০২০ সালে সীমান্ত শহর মাইকাওতে দেশটির প্রথম মুসলিম মেয়র নির্বাচিত হন। লাতিন আমেরিকায় মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির সূচনা মূলত অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর। ১৯৭০-এর দশকে লেবাননের গৃহযুদ্ধের সময় বিপুলসংখ্যক লেবানিজ কলম্বিয়ায় আশ্রয় নেন। তাদের অনেকেই মাইকাওতে বসতি স্থাপন করেন, যেখানে ১৯৯৭ সালে নির্মিত হয় লাতিন আমেরিকার অন্যতম বৃহৎ মসজিদ।
বোগোতার কুরতুবি ইসলামিক সেন্টারের ইমাম শায়খ আহমাদ কুরতুবির মতে, তারাবির নামাজে ১০ থেকে ১৫টি দেশের মুসলমান একত্রিত হন। তার হিসাব অনুযায়ী, মুসল্লিদের মধ্যে ১০০ থেকে ২০০ জন নতুন ধর্মান্তরিত মুসলমান।
ভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির কারণে একটি সুসংহত কমিউনিটি গড়া সহজ নয়। তবু এই বৈচিত্র্যই কলম্বিয়ার রমজানকে অনন্য করে তুলেছে। ইফতারে এখানে মধ্যপ্রাচ্যের ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি মরক্কো, পাকিস্তান কিংবা খাঁটি কলম্বিয়ান পদও থাকে। প্রতিদিন ভিন্ন পরিবার ইফতারের আয়োজন করে।
সিরীয় বংশোদ্ভূত আলেম শায়খ আহমদ তাইয়েল ও তার স্ত্রী ইফতারে কলম্বিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘আজিয়াকো সান্তাফেরেনো’ স্যুপ পরিবেশন করেন তিন ধরনের আন্দিজ আলু, মুরগি, ভুট্টা ও অ্যাভোকাডো দিয়ে তৈরি এ খাবার যেন তাদের দুই ভুবনের সেতুবন্ধন।
১৯৯২ সালে সিরিয়ার নিপীড়ন থেকে পালিয়ে কলম্বিয়ায় আশ্রয় নেন শায়খ তাইয়েল। তখন বোগোতায় মুসলমানরা ছোট একটি ঘরে নামাজ আদায় করতেন। তার নেতৃত্বে ১৫ বছর আগে বোগোতার ৮০ নম্বর স্ট্রিটে নির্মিত হয় আবু বকর সিদ্দিক মসজিদ। ঈদের দিনে এখানে প্রায় ৩০০ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন।
মসজিদটি এখন শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং একটি সামাজিক কেন্দ্র। প্রায় ৪০ শতাংশ মুসল্লি ধর্মান্তরিত। তাদের একজন সিলভিয়া আলাগুনা জানান, জীবনের নানা প্রশ্নের উত্তর তিনি ইসলামে খুঁজে পেয়েছেন।
শায়খ তাইয়েলের মতে, রমজান শুধু রোজা রাখার মাস নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের চর্চার সময়। যাকাতের অর্থ দিয়ে প্রতিবেশী ও পথচারীদের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়।
গত বছর মসজিদের ইফতার আয়োজনে ক্যাথলিক, ইহুদি, ইভানজেলিক্যাল ও মরমন ধর্মীয় নেতারা একসঙ্গে অংশ নেন। সেই সন্ধ্যায় এক বাটি কলম্বিয়ান স্যুপের মাধ্যমে ধর্মের সীমা ছাড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের বার্তা।
সূত্র: আল জাজিরা, আনাদোলু এজেন্সি
সম্পর্কিত
জনপ্রিয়
সর্বশেষ
আন্তর্জাতিক থেকে আরও পড়ুন
আহত হলেও নিরাপদে আছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি
যুদ্ধকালীন ঘটনায় আহত হলেও বর্তমানে নিরাপদ ও সুস্থ আছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। বুধবার (১১ মার্চ) এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ছেলে ও সরকারের উপদেষ্টা ইউসেফ পেজেশকিয়ান।

ট্রাম্পকে চাপে ফেলতে দীর্ঘ যুদ্ধের কৌশল নিচ্ছে ইরান, বলছেন বিশ্লেষকরা
যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও একাধিক ফ্রন্টে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরান। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাইরে থেকে ইরানের প্রতিক্রিয়া কিছুটা অগোছালো মনে হলেও বাস্তবে এটি শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার একটি পুরোনো যুদ্ধ কৌশলের অংশ।

ইরান ও লেবাননে নতুন করে ইসরায়েলি হামলা, বৈরুতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও তীব্র হয়েছে। ইরান ও লেবাননের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। একই সময়ে ইরানও পাল্টা হামলার দাবি করেছে, যার ফলে পুরো অঞ্চলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় হোম অফিস চালু থাইল্যান্ড–ভিয়েতনামে
জ্বালানি সাশ্রয় এবং তেলের দামের অস্থিরতা সামাল দিতে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য হোম অফিস পদ্ধতি চালুর নির্দেশ দিয়েছে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। মঙ্গলবার (১০ মার্চ) দেশ দুটির সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসা থেকে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।


.jpg)






