জেন-জির নেতৃত্বে রাস্তায় নেমে এসেছিল একটি প্রজন্ম। তাদের কণ্ঠে ছিল পরিবর্তনের দাবি, চোখে ছিল নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন। সেই জেন-জির নেতৃত্বেই সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে দীর্ঘদিনের শাসক শেখ হাসিনার। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি প্রজন্ম আশা করেছিল রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তনের। তবে সেই আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া প্রথম জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে আজ অনেক তরুণই প্রশ্ন তুলছেন এ নির্বাচন কি সত্যিই নতুন রাজনীতির সূচনা, নাকি পুরোনো শক্তির প্রত্যাবর্তন?

জেন–জি তরুণদের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া ছাত্র বিক্ষোভ দ্রুত গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। সরকারের কঠোর দমন–পীড়নে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ওই সময় প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে সেনাবাহিনী গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর আগস্টে বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে প্রবেশ করলে শেখ হাসিনা হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঢাকার একটি আদালত শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

citytouch 728-X-90

এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে এবারের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ। এতে রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় তিনিই নির্বাচনী রাজনীতিতে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।

একই সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান। দীর্ঘদিন দমন–পীড়নের শিকার হওয়া দলটি এবারের নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। তবে কোনো নারী প্রার্থী না দেওয়ার সিদ্ধান্ত দলটির প্রতি নতুন করে সমালোচনা তৈরি করেছে, যা সমাজের একটি বড় অংশের কাছে তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

অন্যদিকে, গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) তরুণদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সিদ্ধান্তকে আন্দোলনের আদর্শ থেকে বিচ্যুতি হিসেবে দেখছেন জেন–জির একটি বড় অংশ। যে আন্দোলন বৈষম্যহীনতা, অন্তর্ভুক্তি ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই স্বপ্নের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার দূরত্ব তরুণদের হতাশ করছে।

তবু সব হতাশার মধ্যেও আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি। অনেকের মতে, এক দশকের মধ্যে এবারের নির্বাচন সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং তুলনামূলকভাবে অবাধ হতে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি কেবল ক্ষমতার হাতবদলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি সত্যিকার অর্থে রাজনীতির চরিত্র বদলের সূচনা করবে?

জেন-জির অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের দরজা খুলে দিয়েছিল। এখন সেই দরজা দিয়ে দেশ কোন পথে হাঁটবে- নতুন রাজনীতির দিকে, নাকি পরিচিত পুরোনো বৃত্তেই ঘুরপাক খাবে-তার উত্তর দেবে এই নির্বাচনই।

তথ্য সূত্র: CNN

শাহারিয়া নয়ন, লেখক ও সাংবাদিক