সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ঘোড়াশাল কেন্দ্রে বিপিডিবির নিজস্ব জনবল প্রায় ৭৫০ জন। আউটসোর্সিং, নিরাপত্তা ও বিভিন্ন আনুষঙ্গিক কাজে নিয়োজিত কর্মীদের যুক্ত করলে মোট জনবল প্রায় আড়াই হাজারে দাঁড়ায়। উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত থাকার পরও এসব কর্মীর বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হচ্ছে বিপিডিবিকে।

কেন্দ্রটি ২১০ একর জায়গার ওপর নির্মিত এবং ১৯৬৭ সালে উৎপাদন শুরু করে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে কেন্দ্রটির বেশ কয়েকটি ইউনিটের কার্যক্ষমতা কমে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস সংকট ও সংস্কারকাজ। ফলে কেন্দ্রটির অধিকাংশ ইউনিট দীর্ঘ সময় ধরে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।

পেট্রোবাংলার গ্যাস সরবরাহসংক্রান্ত তথ্য এবং পাওয়ার গ্রিডের উৎপাদন তথ্যেও সম্প্রতি ঘোড়াশালের কোনো ইউনিট চালু না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঘোড়াশাল-পলাশ সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহের পর বিদ্যমান পাইপলাইনের মাধ্যমে কেন্দ্রটিতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

citytouch 728-X-90

কম উৎপাদন, বাড়ছে ইউনিটপ্রতি ব্যয়

ঘোড়াশালসহ বিপিডিবির নিজস্ব বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সংস্থাটির সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। বিপিডিবির হিসাবে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নিজস্ব কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় ব্যয় ছিল ৮ টাকা ৪৭ পয়সা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ টাকা ২৬ পয়সায়।

বিপিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ৬ হাজার মেগাওয়াট হলেও গত অর্থবছরে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সংস্থাটির অংশ ছিল মাত্র ১৩ শতাংশ।

সাত ইউনিটের অধিকাংশই অকার্যকর

ঘোড়াশাল কেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের সম্মিলিত সক্ষমতা ১১০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিটই বর্তমানে অবসরে রয়েছে। ২৬০ মেগাওয়াট সক্ষমতার তৃতীয় ইউনিটে রিপাওয়ারিং বা সংস্কারকাজ চলছে।

তৃতীয় ইউনিটের কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে ৪০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের জন্য চীনের এইচএসবিসি ব্যাংক থেকে নেওয়া ৯৭ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার ঋণের বিপরীতে বিপিডিবির গ্যারান্টি রয়েছে।

চতুর্থ ইউনিটেও রিপাওয়ারিং চলছে। পঞ্চম ও চতুর্থ ইউনিটে মাঝে মাঝে গ্যাস পাওয়া গেলে উৎপাদন চালু করা হয়। ষষ্ঠ ইউনিটে বর্তমানে উৎপাদন কার্যক্রম নেই। সপ্তম ইউনিটও কয়েক মাস আগে গ্যাস পাওয়া সাপেক্ষে চালানো হয়েছিল।

বিপিডিবির ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় ইউনিট থেকে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি। চতুর্থ ইউনিট থেকে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৬৬ মেগাওয়াট। পঞ্চম ইউনিট থেকে ১৩ মেগাওয়াট এবং সপ্তম ইউনিট থেকে ৭৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। অর্থাৎ, সক্ষমতার তুলনায় উৎপাদন ছিল অত্যন্ত নগণ্য।

একই সক্ষমতার বেসরকারি কেন্দ্রে জনবল অনেক কম

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘোড়াশাল কেন্দ্রের বিপুল জনবল এখন বিপিডিবির জন্য বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনায় প্রকৌশলী, ব্যবস্থাপক, তত্ত্বাবধায়ক, আবাসিক ও নিরাপত্তাকর্মীসহ প্রায় ৩০০ জন জনবলই যথেষ্ট।

সেই তুলনায় ঘোড়াশালে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ যুক্ত থাকায় জনবল ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, বিপিডিবির উচিত নতুন নিয়োগের পরিবর্তে বিদ্যমান জনবলকে অন্য চালু বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজে লাগানোর বিষয়টি বিবেচনা করা। তাঁর মতে, আর্থিকভাবে দুর্বল বিপিডিবিকে এখন দক্ষতা বাড়িয়ে ব্যয় কমানোর দিকে নজর দিতে হবে।

জনবল কমানোর উদ্যোগ, গ্যাস সরবরাহে নতুন পাইপলাইন

বিপিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, কেন্দ্রটি উৎপাদনে না থাকায় ইতোমধ্যে কিছু জনবল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আরও কিছু জনবল সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। তবে কেন্দ্রের স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন পুনরায় চালুর জন্য প্রয়োজনীয় কিছু জনবল রাখা জরুরি।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, ঘোড়াশাল কেন্দ্র পুনরায় চালুর জন্য নতুন একটি ডেডিকেটেড গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মনোহরদী-ঘোড়াশাল পাইপলাইনটি গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ (জিটিসিএল) নির্মাণ করবে।

ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, পাইপলাইনটি নির্মাণে এক বছরের বেশি সময় লাগতে পারে।

ফলে ঘোড়াশাল কেন্দ্রের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ—পর্যাপ্ত গ্যাস নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফেরা এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবলের ব্যয় কমানো। বিপিডিবির আর্থিক চাপ কমাতে এ দুটি সমস্যার দ্রুত সমাধান জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।