জাপানি ম্যাকাক প্রজাতির বানর ‘পাঞ্চ’। জন্মের পরই মা তাকে ফেলে চলে যায়। এমন পরিস্থিতিতে চিড়িয়াখানার কর্মীরা তাকে ওরাংওটাংয়ের একটি পুতুল খেলতে দেন। মায়ের আদর না পাওয়া পাঞ্চের সেই পুতুল আঁকড়ে ধরে থাকার দৃশ্য এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক মহলের নজর কেড়েছে।

মায়ের স্নেহ না পেয়ে একটি নরম পুতুলকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে ছোট্ট এক বানরছানা। জাপানের ইচিকাওয়া চিড়িয়াখানার জাপানি ম্যাকাক প্রজাতির সেই বানরের নাম ‘পাঞ্চ’। জন্মের পরপরই মা তাকে ফেলে চলে যায়। এরপর চিড়িয়াখানার কর্মীরা তার হাতে তুলে দেন ওরাংওটাংয়ের একটি নরম পুতুল। এখন সেই পুতুলই তার একমাত্র সঙ্গী, নিরাপত্তার প্রতীক।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে দেখা যায়, অন্য বানরদের আক্রমণ ও তাড়াহুড়ার মধ্যে ভয়ে পুতুলটিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে আছে পাঞ্চ। কখনো তাকে ধাওয়া করা হচ্ছে, কখনো টেনেহিঁচড়ে নেওয়া হচ্ছে। আবার একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মার খেয়ে সে একটি পাথরের আড়ালে আশ্রয় নিয়েছে—তবু বুকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুতুলটি।

citytouch 728-X-90

কেন মা ছানাকে ফেলে যায়?

এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মনে। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রাইমেট বিশেষজ্ঞ অ্যালিসন বেহির মতে, বানরদের মধ্যে এমন আচরণ খুব সাধারণ নয়। তবে বয়স, শারীরিক অবস্থা বা অনভিজ্ঞতার কারণে মা কখনো কখনো সন্তানের দায়িত্ব নিতে ব্যর্থ হতে পারে।

পাঞ্চের ক্ষেত্রে জানা গেছে, তার মা প্রথমবার সন্তান জন্ম দিয়েছিল। ফলে মাতৃত্বের অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল। একই সঙ্গে তীব্র দাবদাহের মধ্যে পাঞ্চের জন্ম হওয়াও একটি বড় কারণ হতে পারে। প্রতিকূল পরিবেশে অনেক মা প্রাণী নিজের বেঁচে থাকা ও ভবিষ্যতে আবার প্রজননের সম্ভাবনাকে অগ্রাধিকার দেয়। দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ ছানাকে তখন তারা ত্যাগ করতেও পারে।

পুতুল কেন?

চিড়িয়াখানার রক্ষক কোসুকে শিকানো জানান, জাপানি ম্যাকাক ছানারা জন্মের পরপরই মায়ের শরীর শক্ত করে আঁকড়ে ধরে থাকে। এতে তাদের পেশিশক্তি বাড়ে এবং একধরনের নিরাপত্তাবোধ তৈরি হয়। কিন্তু পাঞ্চের সেই সুযোগ ছিল না। প্রথমে তাকে তোয়ালে দেওয়া হলেও তাতে কাজ হয়নি। পরে বানরের মতো দেখতে একটি ওরাংওটাং পুতুল দেওয়া হয়, যাতে সে আঁকড়ে ধরার মতো কিছু পায় এবং ভবিষ্যতে অন্য বানরদের সঙ্গে মিশতে কিছুটা স্বস্তি বোধ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাত্র ছয় মাস বয়সী পাঞ্চের জন্য মাতৃস্নেহ অত্যন্ত জরুরি। পুতুলটি তার কাছে মায়ের অনুপস্থিতির শূন্যস্থান আংশিকভাবে পূরণ করছে।

প্রাইমেট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অন্য বানরদের আচরণ পুরোপুরি অস্বাভাবিক নয়। জাপানি ম্যাকাকদের মধ্যে কঠোর মাতৃবংশীয় সামাজিক স্তরবিন্যাস রয়েছে। শক্তিশালী পরিবারগুলো নিচের সারির সদস্যদের ওপর প্রভাব খাটায়। পাঞ্চের মা পাশে থাকলেও হয়তো তাকে সামাজিক চাপে পড়তে হতো।

পাঞ্চের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের ভিড় বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটির সংরক্ষণ মনোবিজ্ঞানী কার্লা লিচফিল্ডের মতে, পাঞ্চের ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল সংকট এবং চিড়িয়াখানার প্রাণী কল্যাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এমন ভাইরাল ঘটনা যেন বানরছানা অবৈধভাবে কেনাবেচার প্রবণতা না বাড়ায়। কারণ ছোট অবস্থায় আদুরে মনে হলেও, কয়েক বছরের মধ্যেই তারা পূর্ণবয়স্ক ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে তখন তাদের সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

একা নয় পাঞ্চ

চিড়িয়াখানার প্রাণীদের এমন তারকাখ্যাতি পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এর আগে থাইল্যান্ডের এক পিগমি জলহস্তীর ছানা ‘মু ডেং’ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

তবে পাঞ্চের গল্প আলাদা। কারণ এটি শুধু একটি বানরছানার সংগ্রামের গল্প নয় এটি প্রকৃতির কঠোর বাস্তবতা, সামাজিক আচরণ এবং মানুষের সহমর্মিতার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।