মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন ও মহান জীবনাদর্শ স্মরণে আগামীকাল ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৬ আগস্ট ২০২৬ বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হবে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। মুসলমানদের কাছে দিনটি শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজন নয়; বরং প্রিয় রাসুল (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা, তাঁর মহান জীবন ও আদর্শ স্মরণ এবং মানবতার জন্য তাঁর রেখে যাওয়া শিক্ষাকে নতুন করে হৃদয়ে ধারণ করার বিশেষ দিন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.), যাঁর নাম উচ্চারণে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ভালোবাসায় ভরে ওঠে। তাঁর জীবন ছিল দয়া, ক্ষমা, ত্যাগ, ন্যায় ও মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত। যে সময় আরব সমাজ অজ্ঞতা, অন্যায় ও বিভেদের অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল, সেই সময় তাঁর আগমন মানুষের সামনে খুলে দেয় সত্য ও ন্যায়ের নতুন পথ। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন, ইসলামের আদর্শ গ্রহণ এবং সৎ ও সুন্দর জীবনযাপনের শিক্ষা দিয়েছেন। শিখিয়েছেন মানুষের প্রতি ভালোবাসা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো, অন্যায় থেকে দূরে থাকা এবং ক্ষমার মাধ্যমে হৃদয় জয় করা।
ইসলামি বর্ষপঞ্জির রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখকে ঈদে মিলাদুন্নবী হিসেবে পালন করা হয়। ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই দিনে পবিত্র মক্কা নগরীতে মহানবী (সা.)-এর আগমন ঘটে। তাঁর জীবন ও কর্ম পরবর্তী সময়ে কোটি কোটি মানুষের জন্য হয়ে ওঠে সত্য, ন্যায়, শান্তি ও মানবতার পথের দিশা।
মহানবী (সা.)-এর জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়গুলোর একটি ছিল তাঁর উম্মতের প্রতি ভালোবাসা। উম্মতের জন্য দুশ্চিন্তা, দোয়া ও মমতার অসংখ্য ঘটনা রয়েছে। নিজের কষ্টের চেয়েও উম্মতের কল্যাণকে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর জীবনের শেষ সময়েও উম্মতের কথা স্মরণ করার বর্ণনা মুসলমানদের হৃদয়ে আজও গভীর আবেগ তৈরি করে।
ইসলাম অনুযায়ী, মেরাজের সেই মহিমান্বিত রাত ছিল মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের অন্যতম বিস্ময়কর ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। মক্কা থেকে মসজিদুল আকসা এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্বজগতের এই অলৌকিক সফরে আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রিয় রাসুলকে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা দান করেন। এই সফরেই মুসলমানদের জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিধান দেওয়া হয়। তাই মেরাজ শুধু একটি অলৌকিক ঘটনা নয়; এটি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, আনুগত্য ও পূর্ণ আত্মসমর্পণের এক গভীর শিক্ষা। জীবনের কঠিন সময় পেরিয়ে মহানবী (সা.)-এর এই সম্মানিত সফর মুসলমানদের মনে আজও জাগায় বিশ্বাস ও আশার আলো আল্লাহর ওপর অটুট আস্থা রাখলে কঠিন সময়ের পরও আসতে পারে সম্মান, স্বস্তি ও নতুন পথের সন্ধান।
ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় আলোচনা, কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া, মিলাদ মাহফিল, নাত ও ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় এরই মধ্যে শুরু হয়েছে নানা কর্মসূচি। বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে রয়েছে বিশেষ আয়োজন। চট্টগ্রামে ঐতিহ্যবাহী জশনে জুলুসকে ঘিরেও রয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।
তবে এই দিনের মাহাত্ম্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা কিংবা আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রিয় রাসুল (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হলো তাঁর আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করা। তাঁর শেখানো সত্য, ন্যায়, দয়া, ক্ষমা ও মানবিকতার পথে চলাই হতে পারে ঈদে মিলাদুন্নবীর প্রকৃত শিক্ষা।
যাঁর হৃদয়জুড়ে ছিল উম্মতের জন্য সীমাহীন মমতা, যাঁর জীবনজুড়ে ছিল মানুষের কল্যাণের বার্তা, সেই মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা শুধু মুখের প্রশংসায় সীমাবদ্ধ না থাকুক। তাঁর শেখানো দয়া, ক্ষমা, সত্য, ন্যায় ও মানবিকতা যদি আমাদের আচরণে ফুটে ওঠে, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর সাহস জাগায় এবং অন্যকে ক্ষমা করার মানসিকতা তৈরি করে তবেই তাঁর আগমনের আলো সত্যিকার অর্থে আমাদের হৃদয়, পরিবার ও সমাজকে আলোকিত করবে। তাঁর আদর্শে বদলে যাক আমাদের জীবন, একটু কোমল হোক আমাদের হৃদয়, আর মানুষের প্রতি ভালোবাসাই হোক সেই মহান শিক্ষার সবচেয়ে সুন্দর প্রতিফলন।










